লেবাননে বিক্ষোভ কেন জোরদার হচ্ছে?



লেবাননে বিক্ষোভ কেন জোরদার হচ্ছে?

পরিবর্তন ডেস্ক | clock৭:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০,২০১৯

লেবাননে বিক্ষোভ কেন জোরদার হচ্ছে?

লেবাননে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দেশটির হাজার হাজার মানুষ রাজধানী বৈরুতের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই বিক্ষোভের সূচনা হয়। আজ রবিবার পর্যন্ত তা আরও জোরদার হয়েছে।


দেশটিতে জরুরি অর্থনৈতিক অবস্থা ঘোষণা, মার্কিন ডলারের সংকট, বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে দ্রব্যপণ্যের উপর মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি, হোয়াটস অ্যাপের কল রেট বৃদ্ধি ও বর্তমান সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে জনগণ। প্রায় সমগ্র দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এ বিক্ষোভ।

সাইয়্যেদ জামান লেবাননের একজন সরকারী কর্মচারী এবং বিক্ষোভের সমর্থক। যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ মাঠে নেমে এসেছে, তিনিও সেই দুর্নীতির শিকার। আজ কয়েকমাস যাবত তিনি বেতন পাচ্ছেন না। অফিসে যাবার পরিবহন ভাড়া দিতেও এখন তার হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিবারের ভরণপোষণ তো আরও পরের কথা। সরকারি অফিসের বেতনের যদি এই অবস্থা হয়, অন্য সাধারণ মানুষের অবস্থা এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

একটি সরকারি ইনস্টিটিউটে নিবন্ধন করতে এসেছেন কামাল আজমি। এই ইনস্টিটিউট পরিচালিত হয় লিবিয়ার সরকারি কিছু আমলার মাধ্যমে। ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা সব ডকুমেন্ট দেখে বললেন, ‘নিবন্ধন করা যাবে না। সিট নেই।’ যদি সিট-ই না থাকে, তাহলে এত ডকুমেন্ট দেখার কী দরকার। দরকার হল—ডকুমেন্ট খতিয়ে দেখেছে কামাল আজমি তাদের কেউ কিনা। ফিরিয়ে দেয়া মানে—বড় কারো মাধ্যম হয়ে এখানে এসো। একা একা আসলে লাভ হবে না। এখানে মাধ্যম ছাড়া কাজ হয় না।

শুধু শিক্ষা ইনস্টিটিউটে নয়, সব জায়গায় এমন দালালদের দৌরাত্ম।

গত সোমবার থেকে লেবাননের পশ্চিমাঞ্চলে শতাধিক বনে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে বৈরুত ও সিডন শহরের আকাশ। আগুন নেভাতে গিয়ে নিহত হয়েছে দুই দমকলকর্মী। কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয় দেশটি। জনগণের পক্ষ থেকে তখন প্রশ্ন উঠে, কয়েক বছর আগেই তো আগুন নেভানোর জন্য মেশিন কেনা হয়েছে। ওগুলো কেনো ব্যবহার করা হচ্ছে না? উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবরান বাসিল বলেছেন, ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে মেশিনগুলো। আর মেশিনগুলো মেরামত করতে পর্যাপ্ত টাকা দেশের নেই।

লেবাননের জনগণের মনে একটি প্রশ্নই ক্ষোভ হয়ে জ্বলছিল, সরকারী কর্মীদের বেতন পরিশোধের টাকা নেই, মেশিন মেরামতের টাকা নেই, তাহলে রাষ্ট্রের টাকা কোথায় গেল? কে চুরি করল দেশের অর্থ?

এদিকে বেড়ে গেছে ডলারের দাম। আগেই ১৫০০ লিরায় পাওয়া যেত এক ডলার। এখন ১৮০০ লিরা লাগবে এক ডলার পেতে। ডলার ছাড়া গতিও নেই লেবাননের মানুষের। সব জায়গায় সব বিল পরিশোধ করতে হয় ডলারে। এমনকি মোবাইলের বিলও। সরকারী দুর্নীতির কারণে এমনিতেই আর্থিক মন্দা, তার উপর ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করাও হয়ে পড়েছে দুঃসাধ্য। ইনস্টিটিউটে, সরকারি দফতরে দালালদের মাধ্যমে, ডলারের দাম বাড়িয়ে দরিদ্র জনগণকে শোষণ চলছেই, কিন্তু জনগণের সুরক্ষা দিতে পারছে না লেবাননের সরকার। দাবানলের আগুনে মানুষ মরে, বেতন না পেয়ে সন্তানের মুখ শুকায়, ফোনের বিল পে করতে গিয়ে পকেট হয় শূন্য। একটা চাপা ক্ষোভ দাউদাউ করে প্রতিটি বুকেই জ্বলছিল।

একদিকে বনাঞ্চলের দাবানল, অন্যদিকে জনগণের মনে ক্ষোভের আগুন, এরমধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপের ভিডিও কলে ২০ সেন্ট কর আরোপের ঘোষণা দেয় সরকার। এই ঘোষণাটিই যেন দেশলাই কাঠি হয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় জনগণের বুকে জমে থাকা ক্ষোভে। বৃহস্পতিবার সন্ধায় শুরু হয় বিক্ষোভ।

শুক্রবার ২০২০ সালের খসড়া বাজেটের বিষয়ে আলোচনার জন্য মন্ত্রীসভার বৈঠক ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি। কথা ছিল সভায় মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করা হবে। দিনের বেলা মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হতেই সন্ধ্যায় অবাক করে দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে জনগণ।

বিবিসি বলছে, গত কয়েক বছরের মধ্যে এমন বড় বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়নি লেবানন। ঘটনার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতেই হোয়াটসঅ্যাপের কর প্রত্যাহার করে লেবাননের সরকার।

সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও বিক্ষোভ থেকে সরে যায়নি জনগণ। বরং তারা এখন সরকার পতনের স্লোগান তুলছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, হোয়াটসঅ্যাপের কর বৃদ্ধিতেই তো পথে নেমেছে তারা, কর তো দূর হয়েছে, এখন কেন ঘরে ফিরে যাচ্ছে না? একটু সুক্ষ্ম বিশ্লেষণে গিয়ে ভাবা দরকার, মাত্র ২০ সেন্ট কর বাড়ানোর জন্যই কি দেশের জনগণ সরকার উৎখাতের ডাক দেয়? কিংবা আদৌ দিতে পারে?

আব্দুল্লাহ নামে এক বিক্ষোভকারী বলেছেন, ‘আমরা শুধু হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ে রাস্তায় নামিনি। মার্কিন ডলারের সংকট, বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের উপর মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি, হোয়াটস অ্যাপের কল রেট বৃদ্ধি ও বর্তমান সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদে আমরা রাস্তায় নেমেছি।

আসলেই তাই। হোয়াটসঅ্যাপ ছিল একটা দেশলাই মাত্র। এতদিনের বঞ্চনার যে ক্ষোভ জমেছিল, হোয়াটসঅ্যাপ সেখানে এক ঘষায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সুতরাং শুধু হোয়াটসঅ্যাপ সমস্যা দূর হলেই তাদের ঘরে ফিরে যাবার কারণ নেই। এই বিক্ষোভ এখনই এইজন্য থামেনি, বরং বাড়ছে।

তবে লেবাননে এইসব আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী সফলতার নজির ইতিহাসে নেই। সেখানে আন্দোলন জন্ম নেয়, হারিয়ে যায়। যেমন ১৮৫৮-৬০ এর মধ্যবর্তী সময়ে খাজন পরিবারের মেরোনাইট সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছিলেন কৃষক তানিয়োস শাহিন। তাদেরকে তিনি তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এরপর শাহিন ড্রুজ সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শাহিন দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করায় বিপ্লব থেমে যায়।

এরপর ১৯৫৮ সালে আরেকটি বিপ্লব দেখতে পায় লেবানন। এখানে লড়াই হয় কামিল শামউনের নেতৃত্বাধীন আমেরিকাপন্থী অক্ষ এবং কামাল জুম্বল্যাটের নেতৃত্বাধীন অ্যাকসিসপন্থী নাসেরবাদী অক্ষের মধ্যে। জয় লাভ করে কামেল শামউন। আমেরিকার হস্তক্ষেপে এই বিপ্লবও সফল হয়নি।

এবারের বিক্ষোভ সরকারের উপর বেশ চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের কাছে রেডিমেট কিছু জবাব থাকে। তারমধ্যে অন্যতম হল—‘আমাদের আগের সরকার অনেক দুর্নীতি করে গেছে। এক দুদিনে আমরা তা সমাধান করতে পারব না। জনগণকে ধৈর্য ধরতে হবে।’ এরপর দিন যাবে, সমাধান আর হবে না। তখন আরেকটি জবাব দিবে—‘বিরোধীপক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।’ একের পর এক এমন চলতেই থাকে।

তাই শুধু হোয়াটসঅ্যাপের কর দূর করার কারণেই থামবে না এই বিক্ষোভ। কারণ এই বিক্ষোভ জমা আছে হাজার দুঃখ, হাজার বঞ্চনা, হাজার চোখের জল। যাদের চোখের সামনে দাবানলে পুড়ে যায় বন, সরকার তাকিয়ে থাকে অসহায়, তারা ফুঁসবেই। যাদের বেতন পায় না নিয়মিত, তাদের উপর যখন চাপানো হয় করের বোঝা, তারা বিক্ষোভ করবেই।

এমএফ/

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ