বেপরোয়া আমলা ঔদ্ধত্য কি ভয়ের নয়?



বেপরোয়া আমলা ঔদ্ধত্য কি ভয়ের নয়?

এখলাসুর রহমান | clock১১:১১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২১,২০২০

বেপরোয়া আমলা ঔদ্ধত্য কি ভয়ের নয়?

কুড়িগ্রামে ডিসির বদলির আদেশ বাতিলে মিষ্টি বিতরণ কারা ও কেন করেছিল? কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের বদলির আদেশ প্রত্যাহার করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পর্যন্ত  ধন্যবাদ জানিয়েছিলো তারা। তারা এই বদলির আদেশ প্রত্যাহারকে আনন্দের সংবাদ হিসেবে নিয়ে মেতে উঠেছিল মিষ্টি বিতরণে৷

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৬১৩ কর্মকর্তাকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিভিন্ন জায়গায় বদলির আদেশ দেন৷

এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনকে উপসচিব হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বদলির আদেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে সেই আদেশ আবার বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সুলতানা পারভীনের বদলির আদেশে প্রতিবাদ করে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাব, কুড়িগ্রাম মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটসহ বিভিন্ন নাগরিক সমাজ৷

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব দেওয়ান মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত বদলি বাতিলের  নির্দেশটি পেলে স্বস্তি ফিরে আসে কুড়িগ্রামের এসব প্রতিবাদকারীর মধ্যে।

তখন কুড়িগ্রামের বিশিষ্ট নাগরিক ও  জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি একেএম সামিউল হক নান্টু বলেছিলেন, অভিনন্দন জেলা প্রশাসক মহোদয়কে তাকে সপদে বহাল রাখার জন্য। কুড়িগ্রামের উন্নয়নে তিনি অবশ্যই তার ‘স্বপ্নকুঁড়ি’র মধ্যদিয়ে কুড়িগ্রামকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু এবার এই ডিসি সম্পর্কে কী বলবেন তিনি?

প্রেস ক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট আহসান হাবীব নীলু জানান, সদাশয় সরকার কুড়িগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে যোগ্য ব্যক্তিকে পুনর্বহাল করেছে। এতে কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

কুড়িগ্রাম মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু বলেন, একমাত্র ডিসি যিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে কুড়িগ্রামের ডিসি হিসেবে সপদে বহাল রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

একজন সরকারি কর্মকর্তার বদলি বাতিলে কি প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা থাকে? আরো একটি প্রশ্ন, কুড়িগ্রামের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কি সুলতানা সরোবর নামকরণটিও সমর্থন করেন?

সাংবাদিক আরিফের নির্যাতনের ঘটনার পরে ডিসি সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন কি? তিনি যা করলেন তাও কি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সমর্থনযোগ্য?

মুক্তিযোদ্ধা, প্রেসক্লাব ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নামে আসলে কী ঘটছে দেশে? নেত্রকোনায় দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক বেগম রোকেয়া৷ আর স্বাবলম্বীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ ভাষাসৈনিকের কবরসহ জায়গা দখলের!

আসলে দেশব্যাপী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি দুর্নীতি প্রতিরোধে কি কোনো ভূমিকা রাখছে না ব্যস্ত রয়েছে আমলা তোষণে? নইলে জনগণের টাকায় পুকুর খনন করে নাম দিল সুলতানা সরোবর কই। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতো টুঁ শব্দটি করলো না এর বিরুদ্ধে৷ আর প্রেসক্লাবগুলোতে কী হচ্ছে? অধিকাংশ জেলাতেই প্রেসক্লাবের সভাপতি থাকে জেলা প্রশাসক৷ আর উপজেলায় ইউএনও৷ এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে কি অন্তরায় নয়? প্রেসক্লাবের নামে এমন নগ্ন আমলা তোষণ কি সাংবাদিকদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে না? প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান এর সভাপতি একজন আমলা কী করে হয়? অধিকাংশ প্রেসক্লাবই তাদের গঠনতন্ত্রে রাজনীতিকদের আসার পথ রুদ্ধ করে রাখে, কিন্তু আমলাদেরকে একেবারে সভাপতি বানিয়ে দেয়? কেন তাদের এই আমলা তোষণ?

একটি ভিডিওতে সাদা শার্ট ও লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধের কলার চেপে ধরে খেতের আল ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর এই ভিডিওটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো৷  

ভিডিওটিতে দেখা যায় ছবির ওই নির্যাতক কুড়িগ্রামের আলোচিত রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন। তবে ভিডিওর ঘটনাটি কক্সবাজারের। নাজিম উদ্দীন যেখানেই গেছেন সেখানেই ঔদ্ধত্যপনা করেছেন৷

এগুলো কিভাবে চলল? একজন আমলার বদলির আদেশ ফেরাতে ফুঁসে ওঠে প্রেসক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি৷ কিন্তু একজন আমলার এমন বেআইনি ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে কেন রুখলো না? আর ইংরেজি ডেপুটি কমিশনারের বাংলা জেলা প্রশাসক হয় কী করে? ডিসি ডেপুটি হলে কমিশনার কে? জাতীয় সংসদে একজন স্পিকার থাকে ও ডেপুটি স্পিকার থাকে৷ মন্ত্রণালয়ে থাকে ডেপুটি সেক্রেটারি৷ কিন্তু এই ডেপুটির অর্থ হয় ভিন্ন৷ অথচ এখানে ডেপুটি কমিশনারের বাংলা হয় জেলা প্রশাসক৷ এই সর্বময় কর্তৃত্বের সংজ্ঞাটি বদল করা উচিত নয় কি? ডিসিকে রাজনৈতিক জবাবদিহিতায় রাখা উচিত নয় কি? সর্বময় কর্তৃত্বের জন্যই  তারা ডেপুটি কমিশনার হিসেবে জেলায় থাকতে চায় ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে মন্ত্রণালয়ে যেতে চায় না৷ কারণ জেলায় ডেপুটির অর্থ এক মন্ত্রণালয়ে ভিন্ন৷

এভাবেই সর্বত্রই আমলা তোষণ চলে আসছে৷ কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনের বদলি ঠেকাতে যারা তৎপর ছিলেন তাদের এখনের বক্তব্য কি? অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নৈতিকতার ধার না ধেরে কেবলই আমলাদের সাথে পরিচয় ঘনিষ্টতা সৃষ্টিতেই ব্যস্ত থাকে৷ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমিটি না থাকলে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে ডিসি ইউএনও, সাংবাদিকদের সংগঠন প্রেসক্লাবের সভাপতিও হয় ডিসি কিংবা ইউএনও৷

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতিও হয় ডিসির পছন্দের লোক৷ ডিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত কমিটিও করা হয় তার অধঃস্তন ও পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে৷ কিন্তু রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে সে তদন্ত কমিটিতেও নিজ দলীয় রাজনীতিকরা নয় সেখানেও আমলারাই থাকে৷ এই আমলানির্ভরতা দিনকে দিন কেবল বেড়েই চলেছে৷ আর তাই বাড়ছে তাদের ঔদ্ধত্য৷ অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি ও জাতীয় সংসদ সদস্যদেরও কোনো পাত্তা দিচ্ছে না তারা৷ এই বেপরোয়া আমলা ঔদ্ধত্যপনা কি ভয়ের নয়?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মতান্তর: আরও পড়ুন

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ