করোনা সংকটে পোল্ট্রি খাত বাঁচাতে প্রণোদনা জরুরি



করোনা সংকটে পোল্ট্রি খাত বাঁচাতে প্রণোদনা জরুরি

আনোয়ার হোসেন | clock৪:১১ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০,২০২০

করোনা সংকটে পোল্ট্রি খাত বাঁচাতে প্রণোদনা জরুরি

ক্ষুদ্র খামারিদের স্বার্থে এবং দেশের মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে পোল্ট্রি খাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

কোভিড -১৯ ও সরকারি প্রণোদনা রপ্তানী শিল্পের জন্য ৫,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা সচলের জন্য রপ্তানি তথা গার্মেন্টসের পরেই যে ইন্ডাস্ট্রির অবদান সেটা হচ্ছে আমাদের পোল্ট্রি/লাইভস্টক ইন্ডাস্ট্রি।

এ খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় নিম্নে তুলনামূলক চিত্র সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস।

গার্মেন্টস শিল্পে কর্মসংস্থান হয় ৪০ লাখ মানুষের। অন্যদিকে পোল্ট্রি শিল্পে কর্মসংস্থান হয় ৭০ লাখ লোকের। গার্মেন্টস শিল্পে উদ্যোক্তা ২০ হাজার আর পোল্ট্রি শিল্পে ২০ লাখ। জিডিপি-তে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান ১৩% হলেও, পোল্ট্রি শিল্পেরও ৪% অবদান রয়েছে।

সাম্প্রতিক মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে আমাদের পোল্ট্রি ও লাইভস্টক ইন্ডাস্ট্রি আজ ক্রান্তিকাল পার করছে। ব্রয়লার মাংসের দাম মাত্র ৬০ টাকা কেজি, ডিম ৬০ টাকা ডজন, দুধ অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। একদিন বয়সী বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে নামমাত্র মূল্য ২-৭ টাকায়। যেখানে প্রতিটি বাচ্চা উৎপাদন ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে বাচ্চা উৎপাদন বন্ধ করার সুযোগও নেই।

বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ মহা ক্রান্তিকালের সম্মুখীন। প্রতিদিন সারা দেশে ত্রিশ লক্ষ ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালী বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে উৎপাদিত বিপুল পরিমান বাচ্চা অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে, তাই ব্রিডারস কোম্পানীগুলো কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

বর্তমানে পোল্ট্রি ফিডের উপকরণের দুস্প্রাপ্যতা ও উচ্চ মূল্যের কারণে ফিড মিলসমূহকে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে ফিড বিক্রয় করতে হচ্ছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অচিরেই বহু ফিড মিল বন্ধ হয়ে যাবে।

বর্তমান বাজার মূল্যে পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি কি পরিমাণ ক্ষতির বোঝা টানছে তার একটি আনুমানিক চিত্র নিচে দেওয়া হলো :

১. সাপ্তাহিক ব্রয়লার উৎপাদন (১.৩০ কোটি কেজি), উৎপাদন খরচ ১.৩০x৯৫=১২৩.৫০/-, বিক্রয় মূল্য ১.৩০x৬০=৭৮.০০/-, ক্ষতি ৪৫.৫০ কোটি টাকা

২. সাপ্তাহিক ডিম উৎপাদন (২১ কোটি পিস), উৎপাদন খরচ ২১ x৬ = ১২৬.০০, বিক্রয় মূল্য ২১x৫= ১০৫.০০, ক্ষতি ২১.০০ কোটি টাকা

৩. সাপ্তাহিক এক দিনের বাচ্চা সাপ্তাহিক (১.৫০ কোটি পিস), উৎপাদন খরচ ১.৫০x৩০=৪৫.০০,বিক্রয় মূল্য ১.৫০x৫=৭.৫০, ক্ষতি ৩৭.৫০ কোটি টাকা

মোট (আনুমানিক সাপ্তাহিক) ক্ষতি ১০১.০০ কোটি টাকা।

করোনা আতংকে বাজারের চাহিদা এমন পর্যায়ে নেমেছে যে, দিন শেষে ব্রয়লার, একদিন বয়সী বাচ্চা, মিল্ক অবিক্রিত থাকছে। পুঁজি হারানোর ভয়ে নতুন করে বাচ্চা নিয়ে লালন-পালন করতে ভয় পাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। একদিনের বাচ্চা উৎপাদন হঠাৎ করে বন্ধ করারও সুযোগ নেই। আবার ব্রয়লার ম্যাচিউরড হওয়ার পরে বেশি দিন ধরে রাখাও সম্ভব নয়। এই অবস্থা চলতে থাকলে খামারগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং বেকার হবে গ্রামের শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত মানুষ। জনগণ হারাবে সস্তায় আমিষ খাবার সুযোগ৷ দেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগবে আবার।

অন্যদিকে, সাধারণ ছুটির কারণের পোল্ট্রি ফিডের উপকরণ পোর্ট থেকে খালাস করা বন্ধ হয়ে গেছে। যদি এভাবে চলতে থাকে তবে ফিড মিলগুলো বন্ধ হবে অচিরেই। ফিড মিল বন্ধ হলে বর্তমানে খামারে থাকা পোল্ট্রি বার্ড না খেয়ে মরবে যা এই করোনা দুর্যোগে নতুন আর একটি দুর্যোগ তৈরি করবে।

পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগ। কোভিড-১৯ এর দুরবস্থায় গার্মেন্টসের জন্য ৫০০০ কোটি টাকা প্রনোদনা দিয়েছেন। প্রশংসা ও সাধুবাদ জানাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টস সেক্টরের ক্ষতির জন্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মালিক পক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অন্যদিকে পোল্ট্রি সেক্টরের ক্ষতির জন্য হাজার উদ্যোক্তা সর্বস্বান্ত হয়। সুতরাং পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির দিকে একটু তাকান। ক্ষুদ্র খামারিদের স্বার্থে তথা দেশের মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আপনার প্রণোদনা একান্ত আবশ্যকীয়।

প্রণোদণা হতে পারে:

১. ক্ষুদ্র খামারিদের নূন্যতম পক্ষে বিদ্যুৎ বিল ৬ মাসের জন্য মওকুফ করা।

২. স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্টের মাধ্যমে পোর্ট থেকে লাইভ স্টক রিলেটেড শিপমেন্ট ক্লিয়ার করা।

৩. গুজব ও ভ্রান্ত ধারণা দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট ডিপার্মেন্টের মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা শুরু করা।

৪. সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রতিটি জেলা/থানা থেকে হতদরিদ্রদের ফ্রি খাবারের সাথে পোল্ট্রির মাংস ও ডিম সরবরাহ করা।

৫. ষড়যন্ত্র ও দুষ্টচক্রের শিকার হয়ে মাঝে মাঝেই সর্বস্বান্ত হতে হয় লাখ লাখ খামারিদের। এই ষড়যন্ত্রকারী ও দুষ্টচক্রকে ঠেকাতে সরকারি অর্গানকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখকঃ

আনোয়ার হোসেন

ম্যানেজিং ডিরেক্টর, সিগমা বাংলাদেশ লিমিটেড

মতান্তর: আরও পড়ুন

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ